
জ.এম.এস রুবেল, লাকসাম (কুমিল্লা): ফেসবুকে আবেগঘন বিদায়বার্তা লেখার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শ্বশুরবাড়ির সামনে মিললো এক যুবকের নিথর দেহ। “বিদায় পৃথিবী, বিদায় আমার প্রিয় স্ত্রী…”—এমন স্ট্যাটাস ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠেছে, এটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যা? ঘটনাটি ঘিরে লাকসামজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চাঞ্চল্য ও নানা গুঞ্জন।
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার (২০ এপ্রিল) ভোরে লাকসাম পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর লাকসাম নোয়াখালী রেললাইন সংলগ্ন চকিদার বাড়ি এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোর প্রায় ৬টার দিকে ইস্রাফিল মজুমদার রাহাত (২১)-কে তার শ্বশুরবাড়ির পাশে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। খবর পেয়ে তার শাশুড়ি কুলসুম বেগম স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত রাহাত লাকসাম উপজেলার উত্তরদা ইউনিয়নের কান্দিরপাড় এলাকার দুলাল হোসেন ও জোসনা বেগমের ছেলে। তার পৈত্রিক বাড়ি একই উপজেলার আজগরা ইউনিয়নের পাওতলি গ্রামে হলেও দীর্ঘদিন ধরে তারা কান্দিরপাড়েই বসবাস করে আসছিলেন।
রাহাতের শাশুড়ি কুলসুম বেগম জানান, সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে জামাইকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা যায়, রাহাত লাকসামে অবস্থিত ইউনিটি ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ওয়ার্ড বয় হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখানেই অন্তরা আক্তারের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং প্রায় দেড় বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। অন্তরার আগের সংসারের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে, যাকে রাহাত নিজের সন্তানের মতোই লালন-পালন করতেন।
তবে দাম্পত্য জীবনে কলহের বিষয়টিও সামনে এসেছে। একটি সূত্রে জানা যায়, অন্তরা আক্তার অন্য এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল এবং অন্তরা তার বাবার বাড়িতে চলে আসেন। বিষয়টি মীমাংসার জন্য আগামী রোববার দুই পক্ষের মধ্যে একটি শালিস বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এর আগেই শ্বশুরবাড়ির পাশে রাহাতের মরদেহ পাওয়া যায়।
রাহাতের মা জোসনা বেগম ছেলের মৃত্যুর জন্য তার স্ত্রী ও শাশুড়িকে দায়ী করে বলেন, “রোববার সকালে রাহাত আমাকে নিয়ে চট্টগ্রামে এক আত্মীয়ের বাসায় যায়। রাতে ডিউটির কথা বলে উদয়ন এক্সপ্রেসে লাকসাম ফিরে আসে। রাত ১২টার দিকে ফোনে পৌঁছানোর কথা জানায়। সকালে তার মৃত্যুর খবর পাই। আমার ছেলেকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মেরে ফেলেছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, একই নারীকে ঘিরে অতীতেও একটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল—এক যুবক জংশন এলাকায় ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ হারান।
ঘটনার আগে রাহাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্টে স্ত্রী অন্তরা আক্তার ও শাশুড়ি কুলসুম বেগমকে দায়ী করে আত্মহত্যার হুমকি দেন বলে জানা গেছে। তার পোস্টগুলোতে ব্যক্তিগত কষ্ট, অভিযোগ এবং দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েনের বিষয় উঠে এসেছে—যা এখন ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজিয়া বিনতে আলম জানান, হাসপাতালে আনার আগেই রাহাতের মৃত্যু হয়েছে। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে লাকসাম থানা পুলিশ লাশের দায়িত্ব নেয়।
লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাকসুদ আহাম্মদ বলেন, “খবর পেয়ে হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে।”
ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো অপরাধ—তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের তদন্তের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে এলাকাবাসী।