
জি.এম.এস রুবেল, লাকসাম (কুমিল্লা): মাত্র আট মাসের নিরলস প্রচেষ্টায় নিজ হাতে সম্পূর্ণ ৩০ পারার পবিত্র কুরআন মাজিদ লিখে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার মুদাফরগঞ্জ এ.ইউ. ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলিম দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুরাইয়া জান্নাত (১৮)। তার লেখা ১১৪টি সুরা সম্বলিত ৬১১ পৃষ্ঠার কুরআন মাজিদটি এতটাই নিখুঁত ও পরিপাটি যে, প্রথম দেখায় এটি ছাপা নাকি হাতে লেখা—তা বোঝা কঠিন।
সুরাইয়ার বাড়ি উপজেলার কান্দিরপাড় ইউনিয়নের চাঁদগাঁও গ্রামে। তিনি সৌদি প্রবাসী নুর হোসেন লিটন ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতির মেয়ে।
বর্তমান সময়ে যখন অনেক তরুণ-তরুণী অবসর সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা মোবাইল ফোনে ব্যয় করেন, তখন সুরাইয়া সেই সময় কাজে লাগিয়েছেন পবিত্র কুরআন মাজিদ স্বহস্তে লিখে। ধৈর্য, একাগ্রতা ও গভীর ধর্মীয় অনুরাগ নিয়ে তিনি প্রতিটি আয়াত অত্যন্ত যত্নসহকারে লিপিবদ্ধ করেছেন।
তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ও সুস্পষ্ট হাতের লেখার কারণে অনেকেই প্রথমে এটিকে কম্পিউটারে ছাপা কপি বলে মনে করেন। পুরো কুরআনের প্রতিটি পৃষ্ঠা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও নির্ভুলভাবে লেখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিকেলে উপজেলার কান্দিরপাড় ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে সুরাইয়া জান্নাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা পদক ও স্মারক প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক রাশেদা আক্তার, লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা, ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুর ইসলাম, কান্দিরপাড় উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হারুনুর রশীদ, দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
সুরাইয়া জান্নাত জানান, পবিত্র কুরআন মহান আল্লাহ তাআলার কালাম। সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে কষ্ট করে কুরআন সংরক্ষণ করেছেন, সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজ হাতে পুরো কুরআন লেখার অনুপ্রেরণা পান। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় নষ্ট না করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মহানবী (সা.)-এর শাফায়াত লাভের আশায় এই কাজ শুরু করেন।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি কুরআন লেখা শুরু করে একই বছরের আগস্ট মাসের শেষ দিকে কাজটি সম্পন্ন করেন। মাদরাসার ক্লাস ও নিজের পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকেই তিনি লেখার কাজ চালিয়ে যান, যাতে লেখাপড়ায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। পুরো কুরআন লিখতে তার প্রায় ৫৫টি কলম এবং ৬১১টি পৃষ্ঠা ব্যবহার হয়েছে।
সুরাইয়া আরও জানান, প্রতিবার লেখা শুরুর আগে তিনি অজু করতেন এবং দরূদ শরিফ পাঠ করে এরপর লেখা শুরু করতেন। তার ছোট ভাই নাহিদ হাসান, আবেদনগর দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী, তাকে এই কাজে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছে। ভবিষ্যতে তিনি হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ সহিহ বুখারিও স্বহস্তে লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং সবার কাছে দোয়া কামনা করেন।
সুরাইয়ার মা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়ের আরবি ভাষা ও আরবি লেখার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। দীর্ঘ আট মাসের সাধনায় নিজ হাতে সম্পূর্ণ কুরআন মাজিদ লিখে সে পরিবারের পাশাপাশি এলাকারও গর্ব হয়ে উঠেছে। মেয়ের এই অসাধারণ অর্জনে তার বাবা তাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দিয়েছেন। ভবিষ্যতে সুরাইয়া অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজের কল্যাণে কাজ করতে চায়।
চাঁদগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী চেয়ারম্যান বলেন, সুরাইয়া ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল কাজে আগ্রহী। অযথা সময় নষ্ট না করে সবসময় ভালো ও ব্যতিক্রমী কিছু করার চেষ্টা করেছে।
লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা বলেন, “এত অল্প বয়সে ৩০ পারার পবিত্র কুরআন মাজিদ নিজ হাতে লিখে সুরাইয়া অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার হাতের লেখা একেবারে ছাপা অক্ষরের মতো। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।”