May 1, 2026, 8:22 pm

লাকসামের মাদরাসাছাত্রী সামিয়া যৌন নির্যাতনের শিকার, অপরাধীরা আজও অধরা

Reporter Name
  • Update Time : Wednesday, April 29, 2026
  • 86 Time View

জি.এম.এস রুবেল, লাকসাম (কুমিল্লা) : লাকসাম ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ১৩ বছর বয়সী সামিয়ার মৃত্যুর এক বছর পার হলেও এখনও উদঘাটিত হয়নি মৃত্যুর সঠিক রহস্য। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা রয়েছে অধরা। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ওই শিশু শিক্ষার্থী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমন প্রতিবেদন প্রকাশের পরও কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি পুলিশ। এটি কি পুলিশের ব্যর্থতা, নাকি অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা—এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মহলে।

সামিয়ার পরিবার এখনও তার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। তার জামা-কাপড়, বই, খাতা-কলম সবই পড়ে রয়েছে—নেই শুধু সামিয়া। এসব স্মৃতি বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তার মা; থামছে না কান্না।

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নাওগোদা গ্রামের সামিয়ার বাড়ি। তার বাবা নিজাম উদ্দিন প্রবাসে থাকেন। ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ মা শারমিন আক্তার মেয়ে সামিয়াকে লাকসাম ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসায় (আবাসিক) ভর্তি করেন। রমজান ও ঈদের ছুটি শেষে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হলে তাকে মাদ্রাসায় রেখে যান।

সামিয়ার মায়ের অভিযোগ, তার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি মীমাংসার জন্য কিছু রাজনৈতিক নেতার মধ্যস্থতায় সামাজিকভাবে সমঝোতার চাপ দেয়।

শারমিন বেগমের দাবি, মেয়ের রহস্যজনক মৃত্যুর পর তিনি একাধিকবার লাকসাম থানায় গেলেও পুলিশ প্রথমে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে সামিয়ার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে তৎকালীন লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদের কাছে আবেদন করেন। অবশেষে ঘটনার ১০ দিন পর, ২৭ এপ্রিল তিনি লাকসাম থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

তিনি অভিযোগ করেন, মামলায় মাদ্রাসার প্রধান, আবাসিক শিক্ষক ও দারোয়ানসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করতে চাইলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি; বরং অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে। তার দাবি, মাদ্রাসা সুপার জামাল উদ্দিন, শিক্ষক শারমিন এবং দারোয়ান খলিলকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন সম্ভব।

নিহত সামিয়ার মা বলেন, “মেয়ের মৃত্যুর পর আমি পুলিশসহ অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। কিন্তু কেউ আমার মেয়ের খুনিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনছে না। এক বছর পেরিয়ে গেলেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি।”

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে যৌন নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্ট হলেও পুলিশের নীরব ভূমিকা নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।

এদিকে ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার প্রধান মো. জামাল উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঈদের ছুটির পর সপ্তাহখানেক আগে ওই শিক্ষার্থীর নিয়মিত ক্লাস শুরু হয়। তবে সে আবাসিকে থাকতে অনাগ্রহী ছিল। ঘটনার দিন (১৭ এপ্রিল) রাতে সে তার মাকে ফোন করে বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। পরে গভীর রাতে মাদ্রাসার পাঁচতলার একটি জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে পালাতে গিয়ে নিচে পড়ে আহত হয়।

তিনি আরও জানান, স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হলে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর সাড়ে ১২টায় তার মৃত্যু হয়।

পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে সামিয়ার বাম হাতে একটি আঘাতের চিহ্ন ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও উল্লেখযোগ্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তার গোপনাঙ্গ ও পায়ুপথে যৌন নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ওই মাদ্রাসায় আরও একাধিক শিক্ষার্থীর অনুরূপ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে পরিবারগুলো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় সেসব ঘটনা তদন্ত ছাড়াই ধামাচাপা পড়ে গেছে। যদিও মাদ্রাসার প্রধান দাবি করেন, সেসব বিষয় সামাজিকভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাকসুদ আহাম্মদ বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেছে এবং তাতে যৌন নির্যাতনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও অন্যান্য সূক্ষ্ম বিষয় উদঘাটনে তদন্ত চলমান।

তিনি আরও জানান, পূর্বের তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) বদলি হওয়ায় নতুন কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে, যার ফলে তদন্ত প্রতিবেদনে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল দিবাগত রাত তিনটার দিকে লাকসাম পৌরসভা কার্যালয় সংলগ্ন ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার পাঁচতলা ভবনের পাশে সড়ক থেকে সামিয়াকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে স্থানীয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয় এবং অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ এপ্রিল দুপুরে তার মৃত্যু হয়।


প্রিন্ট

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category