October 13, 2026, 1:06 am

নাঙ্গলকোটে বিএনপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ২৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, সাংবাদিককে হত্যার হুমকি

Reporter Name
  • Update Time : Tuesday, October 13, 2026
  • 3 Time View

নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার জোড্ডা পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন মজুমদারের বিরুদ্ধে উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ২৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে জন্মনিবন্ধন ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা দিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন সেবাগ্রহীতারা। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহের পর সাংবাদিক রাশেদ হোসাইনকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলা ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত ১১ অক্টোবর নাঙ্গলকোট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন ওই সাংবাদিক।

ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, প্রতিবছর ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ উন্নয়ন তহবিলে প্রায় সাত লাখ টাকা জমা হয়। তবে গত চার বছরে তাঁরা এ খাত থেকে কোনো অর্থ বা প্রকল্প বরাদ্দ পাননি। তাঁদের দাবি, এ সময়ে তহবিলে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ টাকা। তবে তহবিলের প্রকৃত আয়-ব্যয় ও অর্থ ব্যবহারের বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।

এ নিয়ে চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন মজুমদারের কথোপকথনের দুটি অডিও রেকর্ডিং নিয়েও আলোচনা চলছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি অডিওতে ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতে শোনা যায়। অন্য একটি অডিওতে রেজুলেশনের মাধ্যমে ১ শতাংশ তহবিলের অর্থ নিজে গ্রহণের বিষয়ে তাঁকে কথা বলতে শোনা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে অডিওগুলোর সত্যতা ও পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

নাগরিক সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ

জন্মনিবন্ধন করতে ৩০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। কান্দাল গ্রামের এক ভুক্তভোগীর দাবি, তিনটি জন্মনিবন্ধনের জন্য তাঁর কাছ থেকে মোট পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। প্রথমে কাজ হবে না বলে জানানো হলেও টাকা দেওয়ার পর এক দিনের মধ্যে নিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন হয় বলে তিনি জানান।

হেসাখাল ইউনিয়নের আজিয়াপাড়া গ্রামের সেলিম অভিযোগ করেন, জোড্ডা পূর্ব ইউনিয়নের পানকরা গ্রামে বিয়ে করার পর স্ত্রীর জন্মনিবন্ধন অনলাইনে করতে জোড্ডা পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদে গেলে তাঁর কাছ থেকে ৩৫০ টাকা নেওয়া হয়। আবেদন ফি, বিদ্যুৎ বিল, অফিস ভাড়া এবং সচিব ও চেয়ারম্যানের জন্য পৃথক অর্থের কথা বলে ওই টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর দাবি।

একই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গোহারুয়া গ্রামের মনির হোসেনের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের সচিব তাঁর কাছ থেকে ৪০০ টাকা নিয়েছেন।

ওয়ারিশ সনদ পেতেও অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ করেছেন মান্দ্রা গ্রামের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবুল হোসেন। তাঁর ভাষ্য, গত ৭ সেপ্টেম্বর বাবা ও দাদার ওয়ারিশ সনদের জন্য আবেদন করেন। পরে আবেদনপত্র নিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে গেলে এক হাজার টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে ৯০০ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগকারীরা এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, নাগরিক সেবার নির্ধারিত ফির তালিকা প্রকাশ এবং ১ শতাংশ উন্নয়ন তহবিলের আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

সাংবাদিককে হত্যার হুমকির অভিযোগে জিডি

এদিকে, অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহের পর সাংবাদিক রাশেদ হোসাইনকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলা ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকের অভিযোগ, চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিন তাঁর ফেসবুক আইডিতে সাংবাদিককে যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানে হামলার হুমকিসংক্রান্ত পোস্ট দেন। চেয়ারম্যানের ভাতিজা সবুজ মজুমদারের বিরুদ্ধেও ফেসবুকে হামলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া চেয়ারম্যানের সহযোগী হিসেবে পরিচিত মির্জা নাজমুন হাসান ফরহাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে তাঁকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন রাশেদ হোসাইন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ অক্টোবর নাঙ্গলকোট থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি। জিডি নম্বর ৪৯৩।

অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন চেয়ারম্যান ও ইউএনও

অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন মজুমদারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন সদস্যের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, তাঁরা লেখাপড়া জানেন না এবং চায়ের দোকানে বসে তাঁর সমালোচনা করেন।

১ শতাংশ উন্নয়ন তহবিলের অর্থের বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের স্বাক্ষরে রেজুলেশনের মাধ্যমে ওই অর্থ তাঁকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ ও ওয়ারিশ সনদে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যস্ততার কথা বলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু রায়হান বলেন, “আমি বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। সংবাদে উত্থাপিত প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করা হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে। দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়রা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, উন্নয়ন তহবিলের হিসাব নিরীক্ষা এবং নাগরিক সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।


প্রিন্ট

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category