May 25, 2026, 12:01 am

লাকসাম ইউনিটি ট্রমা হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল

Reporter Name
  • Update Time : Wednesday, May 20, 2026
  • 18 Time View

লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: কুমিল্লার লাকসামের লাকসাম ইউনিটি ট্রমা এন্ড জেনারেল হাসপাতাল-এ অপারেশনের সময় এক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। প্রতিবেদনে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে গুরুতর অনিয়ম, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড লঙ্ঘনের নানা তথ্য উঠে এসেছে।

গত ৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় হাসপাতালে অপারেশন চলাকালীন ওই শিশুর মৃত্যু হয়। ঘটনাটিকে গুরুতর ও দুঃখজনক উল্লেখ করে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ ১০ এপ্রিল তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

কমিটিতে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজিয়া বিনতে আলমকে সভাপতি, মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট (অর্থোপেডিক) ডা. সুমন চন্দ্র দত্তকে সদস্য এবং কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের এমও (অ্যানেস্থেশিয়া) ডা. আব্দুল্লাহ আল কাওসারকে সদস্য সচিব করা হয়।

তদন্ত কমিটিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় অবহেলা বা অনিয়ম শনাক্ত, দায়ী ব্যক্তি নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও কমিটি ১৮ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করে।

তদন্ত প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে প্রয়োজনীয় জীবাণুমুক্ত পরিবেশ (Aseptic Condition) বজায় রাখা হয়নি। বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া যন্ত্রপাতির ওপর ধুলাবালির আস্তরণ দেখা গেছে, যা গ্রহণযোগ্য চিকিৎসা মানদণ্ডের পরিপন্থী।

অপারেশনে ব্যবহৃত চেতনানাশক মেশিনেও একাধিক যান্ত্রিক ত্রুটি পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মেশিনটিতে “লিংক-২৫” বা “হাইপক্সিক গার্ড সিস্টেম” নামের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। এই সিস্টেম ছাড়া মেশিন ব্যবহার রোগীর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া অপারেশন চলাকালীন রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী মনিটরিং ডিভাইস, যেমন— ইসিজি মনিটর ও ব্লাড প্রেসার মেশিনের অনুপস্থিতিও তদন্তে ধরা পড়ে। এটিকে “স্ট্যান্ডার্ড পেরি-অপারেটিভ মনিটরিং গাইডলাইন” লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হাসপাতালে কোনো প্রি-অপারেটিভ কিংবা পোস্ট-অপারেটিভ রুম নেই। ফলে রোগীর অপারেশনের পূর্ব প্রস্তুতি ও পরবর্তী নিবিড় পর্যবেক্ষণ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। এতে অপারেশন-পরবর্তী জটিলতার ঝুঁকি বেড়েছে।

অপারেশনের আগে রোগীর প্রি-অ্যানেস্থেটিক চেকআপ ফর্ম পূরণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আমেরিকান সোসাইটি অব অ্যানেস্থেসিওলজিস্টস (ASA) গাইডলাইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রি-অপারেটিভ মূল্যায়ন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া অপারেশনের সময় ব্যবহৃত ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধের কোনো নথি সংরক্ষণ করা হয়নি। রোগীর অভিভাবকদের অ্যানেস্থেশিয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে যথাযথভাবে কাউন্সেলিং করা হয়নি বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

রোগী পর্যবেক্ষণ ও রেফার প্রক্রিয়ায় গাফিলতি

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপারেশনের সময় রোগীর ক্লিনিক্যাল অবস্থা পর্যবেক্ষণে ঘাটতি ছিল। রোগীর ভাইটালস মনিটরিংয়ের কোনো ডকুমেন্টেশন ছিল না এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

রোগীর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হওয়ার পর সিপিআর শুরু করা হলেও তা গাইডলাইন অনুযায়ী অনুসরণ করা হয়নি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য আইসিইউতে রেফারের সময় রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সে কোনো মনিটরিং ডিভাইস কিংবা অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ছিল না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত কমিটির মতে, এসব ত্রুটি শিশুটির মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অপারেশন থিয়েটারে দায়িত্ব পালনকারী ওটি সহায়ক ও নার্সদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে।

এছাড়া ২০১৮-২০১৯ সালের পর হাসপাতালটির লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ

তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

ASA গাইডলাইন অনুযায়ী প্রি-অ্যানেস্থেটিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা

অপারেশনের আগে রোগী ও স্বজনদের যথাযথ কাউন্সেলিং ও সম্মতিপত্র গ্রহণ

দক্ষ সার্জিক্যাল টিম ও অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট নিশ্চিত করা

WHO Surgical Safety Checklist ও Infection Prevention and Control (IPC) নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণ

অপারেশন থিয়েটারে প্রি-অপারেটিভ ও পোস্ট-অপারেটিভ রুম স্থাপন

রোগীর নিয়মিত মনিটরিং ও চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ

হাসপাতালের স্টাফদের নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা

জটিল রোগী রেফারের সময় প্রয়োজনীয় সাপোর্ট ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা।


প্রিন্ট

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category