শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক বিস্ময়কর চরিত্র। তরুণ বয়সে মুসলিম লীগের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনীতির হাতেখড়ি লাভ করেন তিনি। তখনই বুঝেছিলেন, পূর্ব বাংলার কৃষক ও সাধারণ মানুষকে শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত করতে হলে পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া জরুরি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় তিনি ছিলেন সক্রিয় কর্মী এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ পায়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুজিব পূর্ব বাংলার মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ে দৃঢ়ভাবে কাজ শুরু করেন। তবে পাকিস্তান ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে তার মনে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও ছিল। সাতই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার আহ্বান থাকলেও সে সময় তিনি পাকিস্তানকে পুরোপুরি ছিন্নভিন্ন করার পক্ষে ছিলেন না বলে মনে হয়।
রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো মওলানা ভাসানীর সঙ্গে তার সম্পর্ক। যদিও তাদের রাজনৈতিক মতবিরোধ ছিল, তবুও ভাসানী তাকে স্নেহ করেছেন। অনেকের মতে, ভাসানীর সমর্থন ছাড়া শেখ মুজিব আজকের শেখ মুজিব হয়ে উঠতে পারতেন না। ছয় দফা ঘোষণার মাধ্যমে তিনি পূর্ব বাংলার স্বার্থরক্ষায় অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রদর্শন করেন। তার মানবিক আচরণ, সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং সিভিল সোসাইটির সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ তাকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনে সহায়তা করে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গণআন্দোলনে তিনি কখনও নেতৃত্ব দিয়েছেন, কখনও নীতিগত কারণে বিপক্ষে থেকেছেন। যত মতবিরোধই থাকুক, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শেখ মুজিবের নামেই সংঘটিত হয়েছিল—এটা ধ্রুব সত্য। তবে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় তার কিছু অপরিকল্পিত পদক্ষেপ, অদূরদর্শিতা এবং ঘনিষ্ঠদের অতিরিক্ত প্রভাব নেশন বিল্ডিংয়ের পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল।
শেখ মুজিবও ছিলেন রক্ত-মাংসের মানুষ—দেবতা নন। বাকশাল গঠন, জাসদ নেতাকর্মী হত্যা, দুর্ভিক্ষসহ নানা ঘটনায় তিনি সমালোচিত হয়েছেন। তবুও একাত্তরের মহান বিজয়ে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে তার অবদান অনস্বীকার্য। ইতিহাসের শিক্ষা হলো—এককালে আকাশচুম্বী জনপ্রিয় এই নেতা সামরিক অভ্যুত্থানে পরিবারসহ নিহত হলেও তখন সারাদেশে বড় কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে শেখ মুজিবকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তার অর্জন ও সীমাবদ্ধতা—দুটোকেই সমানভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। এভাবেই আমরা ইতিহাস থেকে শিখতে পারব এবং ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পথনির্দেশ খুঁজে পাব।